মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩১ অপরাহ্ন
Title :
ইপসউইচ ইজতেমা: আমরা কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক বার্তা রেখে যাচ্ছি-মাহবুবুল করিম সুয়েদ বুধবার ‘মার্চ টু শিক্ষা মন্ত্রণালয়’ ঘোষণা এবার এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিতের দাবি রিজভীর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে শান্ত থাকার আহ্বান চীনের সংঘাতের মধ্যেই তেহরানে অবতরণ করেছে রাশিয়ার কমান্ড পরমাণু বিমান বন্যাকবলিত এলাকায় স্বাস্থ্যের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল: স্বাস্থ্যমন্ত্রী পলাতক শেখ হাসিনাকে জেলে যেতেই হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পে-স্কেল নিয়ে আইএমএফের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি: অর্থমন্ত্রী ‘কঠিন সময়ে বাংলাদেশের ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের পাশে আছে মালদ্বীপ’ ওয়াশিংটনের আক্রমণের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিতে তেহরানের পাল্টা হামলা

ইপসউইচ ইজতেমা: আমরা কি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সঠিক বার্তা রেখে যাচ্ছি-মাহবুবুল করিম সুয়েদ

  • Update Time : মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬
  • ৪ Time View

যুক্তরাজ্যের ইপসউইচে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক ইজতেমা শুধু একটি ধর্মীয় সমাবেশ নয়; এটি ব্রিটিশ মুসলিম সমাজের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ আত্মসমালোচনার সুযোগ এনে দিয়েছে। একটি প্রশ্ন আজ আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য কী ধরনের ইসলামী পরিচয় রেখে যাচ্ছি?

ব্রিটেনে বসবাসকারী মুসলমানরা বহু বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম, শিক্ষা, ব্যবসা, চিকিৎসা, আইন, রাজনীতি এবং জনসেবার মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। হাজারো মুসলিম শিক্ষক, ডাক্তার, উদ্যোক্তা, আইনজীবী, সাংবাদিক ও জনপ্রতিনিধি এই দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনসাধারণের চোখে মুসলিম সমাজের পরিচয় অনেক সময় নির্ধারিত হয় কয়েকটি বহুল আলোচিত ঘটনার মাধ্যমে।

সেখানেই আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার।

তাবলিগ জামাত একটি সুপরিচিত দাওয়াতি আন্দোলন। তাদের অনুসারীরা এটিকে ইসলামের শিক্ষা প্রচারের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন। আবার বহু মুসলিম আছেন, যারা ইসলাম পালন করেন কিন্তু এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নন। তাই একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা জরুরি—কোনো একটি ধর্মীয় আন্দোলন পুরো মুসলিম সমাজ বা পুরো ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করে না।

আমার উদ্বেগ অন্য জায়গায়।

আমরা কি এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলছি, যারা ইসলামকে কুরআন, সহিহ সুন্নাহ, জ্ঞানচর্চা এবং উত্তম চরিত্রের আলোকে জানবে? নাকি তারা ইসলামকে বিভিন্ন সংগঠন, দল বা আন্দোলনের পরিচয়ের মাধ্যমে চিনতে শিখবে?

যখন কোনো সংগঠন মুসলিম পরিচয়ের সবচেয়ে দৃশ্যমান রূপ হয়ে ওঠে, তখন বাইরের সমাজও সেই সংগঠনকেই পুরো ইসলামের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে শুরু করে। এটি বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় মিল না থাকলেও জনমত প্রায়ই এভাবেই গঠিত হয়।

আর এখানেই রাজনৈতিক ঝুঁকি।

ইউরোপজুড়ে অভিবাসন, ধর্মীয় পরিচয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। যুক্তরাজ্যও এর বাইরে নয়। সংসদীয় বিতর্ক, স্থানীয় নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচনে অভিবাসন ও সামাজিক সংহতি এখন বড় রাজনৈতিক ইস্যু। এই প্রেক্ষাপটে মুসলিম সমাজকে ঘিরে যেকোনো বড় ঘটনা রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরির উপাদান হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন হলো—এই ভাষ্য কে তৈরি করবে?

আমরা, নাকি অন্য কেউ?

যদি মুসলিম সমাজ নিজেদের কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা, দায়িত্বশীলতা এবং সমাজের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই শূন্যস্থান অন্যরা পূরণ করবে। তখন মুসলমানদের সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা গড়ে উঠবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিও, উত্তেজনাপূর্ণ শিরোনাম বা রাজনৈতিক স্লোগানের মাধ্যমে—বাস্তব অভিজ্ঞতার মাধ্যমে নয়।

এর সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে আমাদের সন্তানরা।

আজ যে শিশু ব্রিটেনে জন্ম নিচ্ছে, আগামী বিশ বছরে সে ডাক্তার, ব্যারিস্টার, বিচারক, সংসদ সদস্য, পুলিশ কর্মকর্তা অথবা শিক্ষক হবে। কিন্তু যদি সমাজে মুসলমানদের সম্পর্কে সন্দেহ, ভয় বা ভুল ধারণা বাড়তে থাকে, তাহলে সেই প্রজন্মকে অতিরিক্ত বাধার মুখোমুখি হতে হতে পারে। তারা তাদের যোগ্যতার পাশাপাশি নিজেদের পরিচয় নিয়েও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে।

এ কারণেই মুসলিম সমাজের প্রতিটি বড় আয়োজন কেবল ধর্মীয় নয়; এটি নাগরিক দায়িত্বেরও বিষয়।

ইসলাম আমাদের শিক্ষা দেয় প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা করতে, প্রতিশ্রুতি পালন করতে, আইন মেনে চলতে এবং মানুষের জন্য সহজতা সৃষ্টি করতে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবন ছিল মানুষের আস্থা অর্জনের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তাঁর দাওয়াত মানুষের হৃদয় জয় করেছিল চরিত্র, ন্যায়বিচার এবং সততার মাধ্যমে।

আজ আমাদেরও সেই পথেই ফিরে যেতে হবে।

আমাদের মসজিদ, ইসলামিক সেন্টার এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়, নাগরিক দায়িত্ব, নেতৃত্ব, শিক্ষাগত উৎকর্ষ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং জনসেবাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের শেখাতে হবে—ভালো মুসলমান হওয়া এবং ভালো ব্রিটিশ নাগরিক হওয়া পরস্পরের বিরোধী নয়; বরং একে অপরকে শক্তিশালী করতে পারে।

আমার এই লেখার উদ্দেশ্য কোনো সংগঠনকে আক্রমণ করা নয়। বরং একটি মৌলিক সত্য স্মরণ করিয়ে দেওয়া—ইসলাম কোনো সংগঠনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ইসলামের ভিত্তি কুরআন ও সহিহ সুন্নাহ। সংগঠন আসবে, সংগঠন বদলাবে, নেতৃত্ব পরিবর্তিত হবে; কিন্তু ইসলামের মূলনীতি অপরিবর্তিত থাকবে।

আজ যদি আমরা আমাদের সন্তানদের সংগঠনের আনুগত্যের চেয়ে আল্লাহর আনুগত্য, দলীয় পরিচয়ের চেয়ে উত্তম চরিত্র, এবং আবেগের চেয়ে জ্ঞানকে বেশি মূল্য দিতে শেখাতে পারি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু ইসলামের সঠিক শিক্ষা লাভ করবে না; তারা এমন নাগরিক হবে, যাদের উপস্থিতি এই দেশের জন্যও সম্পদ হয়ে উঠবে।

এটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। কারণ ইতিহাস প্রমাণ করে—একটি সম্প্রদায়কে তার স্লোগান নয়, তার চরিত্রই দীর্ঘমেয়াদে পরিচিত করে।

এই সংস্করণটি যুক্তরাজ্যের একটি বাংলা সংবাদপত্র বা মতামত পাতায় প্রকাশযোগ্য ধাঁচে লেখা হয়েছে। এটি সমালোচনামূলক হলেও কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সম্পর্কে অপ্রমাণিত অভিযোগ বা চূড়ান্ত ধর্মীয় সিদ্ধান্ত দেয় না, ফলে পাঠকদের কাছে যুক্তিনির্ভর ও বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category