রাজধানীর রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন ও শক্তিশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমান। রোববার বিকেলে রাজধানীর বিআইএসএস (BIISS) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে তিনি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে নারীর অবস্থান, নিরাপত্তা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিয়ে এক দূরদর্শী রূপরেখা পেশ করেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কেবল সংখ্যার অনুপাতে নয়, বরং গুণগত মানে নারীদের শীর্ষস্থানে দেখতে চান জাইমা রহমান। রোববার রাজধানীর একটি সেমিনারে দেওয়া বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নারী কর্মীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব নিতে হবে। একইসাথে তিনি নারী নেতৃত্বের বিকাশকে একটি ‘পাইপলাইন’ প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করে ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত ধারাবাহিকতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
জাইমা রহমান মনে করেন, হুট করে কাউকে নেতৃত্বে বসিয়ে দিলেই নারী জাগরণ সম্ভব নয়। তাঁর মতে, তৃণমূল থেকে উত্থান: ছাত্র নেতৃত্ব থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার পর্যন্ত এমন একটি পদ্ধতি বা ‘পাইপলাইন’ তৈরি করতে হবে, যার মাধ্যমে যোগ্য নেত্রীরা উঠে আসবেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে না পারলে আমরা মেধাবী নারী নেত্রীদের হারিয়ে ফেলব। ভালো ভালো নেত্রীদের সুযোগ দেওয়ার জন্য পরিবেশটি স্থায়ী হওয়া প্রয়োজন।
নারীদের রাজনীতিতে আসার পথে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো তুলে ধরতে গিয়ে জাইমা একটি চমৎকার উপমা ব্যবহার করেন।
তিনি বলেন, তালগাছের ছায়ার মতো যদি কেউ বড় একজন পাশে না থাকে, তাহলে ছোট চারাগাছটি কীভাবে বড় হবে? আমরা দেখি পুরুষদের জন্য অনেক রকম সুযোগ-সুবিধা থাকে, কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে তা অনেক সীমিত। রাজনীতি ও নাগরিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হলে বড় রাজনৈতিক গাছ বা শক্তিগুলোকে ছোটদের ছায়া দিয়ে আগলে রাখতে হবে।
তিনি আরও যোগ করেন যে, অর্থনীতি রাজনীতিতে এক বড় ফ্যাক্টর। অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে অনেক যোগ্য নারী পিছিয়ে পড়ছেন। নারী নেত্রীদের প্রয়োজনীয় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুবিধা দেওয়া হলে রাজনীতিতে তাঁদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
নারীদের নিরাপত্তার প্রশ্নে জাইমা রহমান অত্যন্ত কঠোর ও গঠনমূলক প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি কেবল রাষ্ট্রের কাছে নিরাপত্তা চাননি, বরং প্রতিটি রাজনৈতিক দলের ভেতরগত কাঠামোর পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন।
তাঁর দাবি, প্রতিটি রাজনৈতিক দলের একটি সুনির্দিষ্ট ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ বা আচরণবিধি থাকতে হবে, কোনো নারী নেত্রী বা কর্মী যদি হয়রানির শিকার হন, তবে সংশ্লিষ্ট দলকে তার পূর্ণ দায় নিতে হবে এবং ভুক্তভোগীর পাশে শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে নারীদের জন্য রাজনীতিকে একটি নিরাপদ পেশা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তরুণ প্রজন্মের মেধা কাজে লাগিয়ে এক ভিন্নধর্মী দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখান জাইমা রহমান। তিনি মনে করেন, চিন্তার জগত পরিবর্তন না করলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সমাজ, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করলে একটি ইনসাফভিত্তিক বা ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
জাইমা রহমানের এই ভাষণ কেবল রাজনৈতিক দলের কর্মী বা নেতাদের জন্য নয়, বরং দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীদের জন্য এক বড় আশার আলো। তাঁর কণ্ঠে আধুনিকতা এবং দেশীয় মূল্যবোধের যে সংমিশ্রণ দেখা গেছে, তা আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার পথে একটি মাইলফলক হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, বড় রাজনৈতিক দলগুলো তাঁর এই ‘নিরাপত্তা কোড’ ও ‘নেতৃত্বের পাইপলাইন’ তত্ত্বকে কতটা গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে।