বাংলাদেশে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক অঙ্গন এখন সরগরম। এই নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা এবং জনঅংশগ্রহণ নিয়ে দেশি-বিদেশি মহলে যখন নানা বিশ্লেষণ চলছে, ঠিক তখনই নিজের প্রত্যাশার কথা জানালেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন। তার মতে, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ৫৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে।
রোববার দুপুরে ‘নির্বাচনী কূটনীতি’ বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে সরকারের যোগাযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
নির্বাচনে জনঅংশগ্রহণ একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মেরুদণ্ড। বিগত কয়েকটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও, এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন বলে মনে করছেন তৌহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য এবং প্রত্যাশা হলো—এবারের জাতীয় নির্বাচনে অন্তত ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়বে। জনগণের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে যে উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে, তাতে এই সংখ্যা অর্জন করা কঠিন হবে না।
উপদেষ্টা মনে করেন, নির্বাচন কমিশন এবং সরকার মিলে ভোটারদের কেন্দ্রে আনার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ও আস্থার পরিবেশ নিশ্চিত করছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটার এবং দীর্ঘ বিরতির পর যারা ভোট দিতে মুখিয়ে আছেন, তাদের উপস্থিতিই এই লক্ষ্যমাত্রাকে স্পর্শ করতে সাহায্য করবে।
বাংলাদেশের নির্বাচন মানেই বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিশেষ তৎপরতা। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টার মন্তব্য ছিল বেশ খোলামেলা। তিনি জানান, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে বিদেশিদের মন্তব্য করা বা উদ্বেগ জানানো এখন একটি ‘গতানুগতিক ধারা’ বা রুটিন ওয়ার্কে পরিণত হয়েছে।
তার মতে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষও এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে নির্বাচনের সময় বিদেশিরা কথা বলবে। তবে সরকার বিদেশিদের সকল যৌক্তিক উদ্বেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনকালীন সহিংসতা রোধে সরকার কী কী কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিয়মিতভাবে বিদেশি মিশনগুলোকে অবহিত করা হচ্ছে। তৌহিদ হোসেন স্পষ্ট করেন যে, সরকার একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য সব ধরনের সহযোগিতা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপদেষ্টাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট ও ভিসা সংক্রান্ত একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য সামনে আসে। শোনা যাচ্ছিল, অনেক উপদেষ্টা দ্রুত ভিসা পাওয়ার সুবিধার্থে তাদের কূটনৈতিক পাসপোর্ট (Red Passport) জমা দিয়ে সাধারণ পাসপোর্ট নিচ্ছেন।
এই বিষয়ে সত্যতা স্বীকার করে তৌহিদ হোসেন বলেন, “হ্যাঁ, কিছু উপদেষ্টা দ্রুত ভিসা পাওয়ার সুবিধার্থে বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কূটনৈতিক পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে এখনো আমার কূটনৈতিক পাসপোর্ট হস্তান্তর করিনি।” বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের ভেতর ও বাইরে নানা গুঞ্জন থাকলেও উপদেষ্টা এটিকে ব্যক্তিগত প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবেই দেখছেন।
নির্বাচনের পরপরই প্রধান উপদেষ্টার সম্ভাব্য জাপান সফর নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর চাউর হয়েছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে এখনো অন্ধকারে। তৌহিদ হোসেন জানান, নির্বাচনের পর প্রধান উপদেষ্টার জাপান সফর নিয়ে তার মন্ত্রণালয়ের কাছে বর্তমানে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য বা শিডিউল নেই। আপাতত সরকারের পুরো মনোযোগ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার দিকেই নিবদ্ধ।
উপদেষ্টা তার বক্তব্যে নির্বাচনকালীন সহিংসতার আশঙ্কার কথা নাকচ করে দেননি। তবে তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং প্রশাসন অত্যন্ত সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। বিদেশিদের সাথে আলাপকালেও সরকার এই বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছে যে, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বরদাশত করা হবে না।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, নির্বাচনী কূটনীতি এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ চায় বিশ্বের কাছে প্রমাণ করতে যে, একটি অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করার সক্ষমতা এ দেশের প্রশাসনের রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে যাচ্ছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টার আজকের এই বক্তব্য সেই গুরুত্বকেই আরও একবার স্পষ্ট করে তুলল। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনের দিনে ভোটাররা কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কেন্দ্রে এসে উপদেষ্টার এই ‘৫৫ শতাংশের’ লক্ষ্যমাত্রাকে বাস্তবে রূপ দেন।