ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন চলাকালীন সংসদীয় রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়ে এবার সরাসরি রাজপথে নামার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দলগুলো।
‘জুলাই সনদ’ কার্যকর এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী দ্রুত সংবিধান সংস্কারের দাবিতে আগামী শনিবার (৪ এপ্রিল) রাজধানীসহ দেশব্যাপী বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য।
সংসদের ভেতরে সরকারের একগুঁয়েমি আচরণের প্রতিবাদে সংসদ সদস্যরা গত বুধবার যে ওয়াকআউটের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, শনিবারের এই কর্মসূচি তারই চূড়ান্ত প্রতিফলন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে অনুষ্ঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান জোটের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ।
এদিন বেলা ১২টায় জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দলের কণ্ঠরোধের অভিযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
বৈঠক শেষে সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আমরা সংসদের ভেতর নিয়মতান্ত্রিকভাবে জনগণের দাবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। কিন্তু সরকার সংসদ পরিচালনায় চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। বিরোধী দলের যুক্তিসঙ্গত দাবিকে উপেক্ষা করে সরকার একতরফা পথে হাঁটছে। এমতাবস্থায় রাজপথের আন্দোলন ছাড়া আমাদের সামনে আর কোনো বিকল্প খোলা নেই।
জোটের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ৪ এপ্রিল (শনিবার) জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এই সমাবেশের মাধ্যমে সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রথম দফার শক্তিমত্তা প্রদর্শন করতে চায় ১১ দলীয় ঐক্য।
তাদের মূল দাবিসমূহ হলো- ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফসল ‘জুলাই সনদ’-এর প্রতিটি দফা অবিলম্বে কার্যকর করা, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় অনুযায়ী সংবিধানের আমূল সংস্কার করা ও সংসদে বিরোধী মতের গুরুত্ব দেওয়া এবং একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে বিরত থাকা।
সরকারকে আলটিমেটাম দিয়ে হামিদুর রহমান আযাদ হুশিয়ারি দেন যে, যদি গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকার দ্রুত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে আন্দোলন আরও কঠোর হবে। তিনি জানান, আগামী ৭ এপ্রিল জোটের পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই দিন আমরা দীর্ঘমেয়াদী আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা ঘোষণা করব। প্রয়োজনে সারাদেশ অচল করে দেওয়া হবে।
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী জোটের নেতারা সরকারের কড়া সমালোচনা করেন। তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার গতানুগতিক সংস্কারের নামে মূলত নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পথ খুঁজছে। হামিদুর রহমান আযাদ সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, বর্তমান সরকার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই ফ্যাসিবাদী পথে হাঁটছে। তারা সংবিধানের মৌলিক সংস্কার না করে কেবল কিছু সংশোধনী এনে বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে চায়।
তিনি আরও যোগ করেন, সরকার কেবল নামকাওয়াস্তে আলোচনার নাটক করছে, বাস্তবে তারা জনগণের ম্যান্ডেট বা গণভোটের ফলাফলকে সম্মান জানাতে ইচ্ছুক নয়।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার মাত্র ছয় দিনের মাথায় সংসদের বাইরে রাজপথ উত্তপ্ত হওয়ার এই ইঙ্গিত দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি করছে। গত বুধবার বিকেলে সংসদে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা যেভাবে ওয়াকআউট করেছিলেন এবং তার পরদিন আজ রাজপথে কর্মসূচির ঘোষণা—সব মিলিয়ে সরকার এক ধরনের চাপে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার যদি সংবিধান সংস্কার কমিশন এবং গণভোটের দাবিগুলোকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা না করে, তবে আগামী ৭ এপ্রিলের পর দেশ একটি দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ধাবিত হতে পারে। বিশেষ করে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন এই ১১ দলীয় জোটের সাংগঠনিক শক্তি রাজপথে সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
শনিবারের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজধানীজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার পরিকল্পনা করছে। ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনে বাধা না থাকলেও জানমালের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সংসদ ও রাজপথ উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ত্রয়োদশ সংসদের শুরুতেই যে সংঘাতের আবহ তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে আলোচনার পথ প্রশস্ত হওয়া জরুরি।
শনিবারের বিক্ষোভ সমাবেশ এবং ৭ এপ্রিলের পরবর্তী রূপরেখা বলে দেবে বাংলাদেশের রাজনীতি কোন পথে যাচ্ছে। জনগণের আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নই এখন রাজপথের মূল স্লোগান হয়ে দাঁড়িয়েছে।