২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থান বা ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এর সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দেশে এখন পর্যন্ত ৮৩৭টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে।
আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলো ছাড়া বাকি সব মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হবে।
এছাড়া হত্যাসহ অন্যান্য গুরুতর অপরাধের মামলাগুলোর তদন্ত ও প্রসিকিউশন কার্যক্রম গতিশীল রাখতে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সরকার।
সোমবার দুপুরে আইন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে সরকার নির্দেশে ছাত্র–জনতার ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ৮৩৭টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫টি মামলা বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া ১৯টি হত্যা মামলার অভিযোগপত্র ইতিমধ্যে দাখিল করেছে পুলিশ।
আইন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই মামলাগুলোর বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন, ২০০০–এর ১০ ধারার বিধান অনুযায়ী সেগুলো পাঠানো হবে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে।
আইন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, হত্যাসহ গুরুতর অপরাধের মামলাগুলোর প্রসিকিউশন কার্যক্রম যাতে বিলম্বিত না হয়, সে লক্ষ্যেই আইন ও বিচার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এ কমিটির কাজ হবে তিনটি। এগুলো হলো জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে সংঘটিত হত্যাসহ অন্যান্য গুরুতর অপরাধের অভিযোগে দায়ের করা মামলার পূর্ণাঙ্গ তালিকা সংগ্রহ করা (মামলার বর্তমান পর্যায় উল্লেখসহ)। এ রকম মামলার মধ্যে যেসব মামলায় অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে, সেসব মামলায় (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা ছাড়া) প্রসিকিউশনের কার্যক্রম পরিচালনায় বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করা (যদি থাকে), এই সমস্যা নিরসনে প্রয়োজনীয় সুপারিশ সরকারের কাছে পাঠানো। আর কমিটি তার কার্যক্রম বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবার ও দেশবাসীকে সময়ে সময়ে অবহিত করবে।
এছাড়া কমিটি তার কার্যক্রম বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবার ও জনগণকে অবহিত করবে, যাতে বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণের আস্থা বজায় থাকে।
দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল আইন ২০০০ সালে প্রণীত হয় প্রধানত গুরুতর অপরাধ হত্যা, বিস্ফোরণ, চাঁদাবাজি, নাশকতা ইত্যাদির দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্দেশ্যে। তবে গত দুই দশকে এ আইন অনেক সময় রাজনৈতিক সংবেদনশীল মামলাতেও প্রযোজ্য হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জুলাইয়ের মতো বড় আন্দোলন, বিক্ষোভ, সহিংসতার ঘটনায় মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হলে রাষ্ট্র ও ভুক্তভোগী উভয়ের জন্যই তা ইতিবাচক, যদি প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ থাকে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন বলেন, ‘যত দ্রুত বিচার হবে, তত দ্রুত ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা আসবে। তবে এ ধরনের মামলায় রাজনৈতিক প্রভাব বা পক্ষপাত যেন না পড়ে, সেটা সরকারকে সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখতে হবে।’
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নিহতদের পরিবার এখনো অনেকেই আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের দাবি, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেও অনেক ক্ষেত্রেই তদন্ত ধীরগতির হওয়ায় তারা হতাশ।
পুরান ঢাকার নিহত ছাত্রনেতা রিয়াজ উদ্দিনের ভাই শাহরিয়ার হোসেন বলেন, ‘আমার ভাইকে দিনের আলোয় গুলি করে মারা হয়েছিল। আমরা মামলা করেছি, কিন্তু এখনও তদন্ত শেষ হয়নি। আমরা শুধু চাই বিচারটা যেন আর বিলম্ব না হয়।‘
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ‘জুলাইয়ের ঘটনাগুলোর তদন্ত জটিল ও বহুমাত্রিক। অনেক ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শী বা ভিডিওপ্রমাণ থাকলেও, কোথাও কোথাও রাজনৈতিক চাপ, আবার কোথাও সাক্ষী অনুপস্থিতি সমস্যা তৈরি করছে। তবে বেশিরভাগ মামলায় অগ্রগতি হয়েছে।’
আইন মন্ত্রণালয়ের মতে, নতুন কমিটি গঠনের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে এই ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করে তদন্ত ও প্রসিকিউশন কার্যক্রমে গতি আনা।
আইন ও মানবাধিকার বিশ্লেষকরা মনে করেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা পাঠানো যেমন দ্রুততার নিশ্চয়তা দেয়, তেমনি বিচারের গুণগত মান রক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ। যে মামলাগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন, সেগুলোর কাঠামো আলাদা সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধ বা পরিকল্পিত গণহত্যার অভিযোগ থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন, ‘এই মামলাগুলোর বিচার শুধু আইনি বিষয় নয়, এটা রাজনৈতিক ন্যায্যতা ও ইতিহাসের দায়ও বহন করে। সুতরাং প্রতিটি রায়ের মধ্যে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের বার্তা থাকতে হবে।’
উল্লেখ্য, গত জুলাই মাসে দেশজুড়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা “জুলাই গণঅভ্যুত্থান” নামে আখ্যা দিয়েছেন। তখন বিভিন্ন ছাত্র ও তরুণ সংগঠন সরকারবিরোধী বিক্ষোভ শুরু করে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। একপর্যায়ে সংঘর্ষ, গুলি ও সহিংসতায় বহু মানুষ নিহত হন।
আন্দোলনের সময় মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু জুলাই মাসে বহু মানুষ হতাহত হয়। এই হত্যাকাণ্ড ও নির্যাতনের ঘটনায় দেশব্যাপী মামলা দায়ের হয় ৮৩৭টি।
আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পর রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতারা বলেছেন, ‘সরকারি ট্রাইব্যুনালে মামলা পাঠানোর সিদ্ধান্ত যেন প্রতিহিংসার বিচার না হয়।’
অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দোষীদের বিচার না হলে গণঅভ্যুত্থানে নিহত ছাত্র-জনতার আত্মা শান্তি পাবে না। এ বিচার ইতিহাসের অংশ।
আইন মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, এই মামলাগুলোর বিচার হবে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারের নীতিতে। সরকার এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে থাকবে।
এতে আরও বলা হয়, বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো প্রভাব বা বিলম্ব সহ্য করা হবে না। রাষ্ট্রের আইনগত কাঠামো অনুযায়ী ভুক্তভোগী পরিবারকে সময় সময়ে অগ্রগতি জানানো হবে।
জুলাই অভ্যুত্থান–পরবর্তী সময়ের এই বিচারযাত্রা বাংলাদেশের রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থার জন্য একটি নতুন অধ্যায় হতে পারে। ৮৩৭টি মামলার ভার কেবল সংখ্যায় নয় এটি এক জাতির ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা, বিচার হোক দ্রুত, কিন্তু ন্যায়সঙ্গত। কারণ, ন্যায়বিচারই কেবল পারে এই জাতির ক্ষত সারাতে, এবং গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের আত্মত্যাগকে অর্থবহ করে তুলতে।